"আব্দুল কাহার আকন্দ: অপরাধী এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।"
শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনকে দীর্ঘায়িত করার পেছনে যে পুলিশ কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল কাহার আকন্দ। তিনি ছিলেন শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত প্রতিশোধের অন্যতম হাতিয়ার। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন নিয়ে একাধিক মামলায় আসামি হলেও এখনও তিনি ধরা পড়েননি।
গত ১৭ বছর ধরে, পুলিশ কর্মকর্তা আব্দুল কাহার আকন্দ সিআইডিতে তদন্তের নামে বিএনপিসহ বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করে বছরের পর বছর কারাগারে আটকে রেখেছেন। তবে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে তিনি বিদেশে পালিয়ে গেছেন। এই আকন্দ তার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অসংখ্য নিরীহ মানুষকে ফাঁসিয়েছেন, যাদের মধ্যে অনেকেই এখনও তার বিরুদ্ধে বিচার চাচ্ছেন।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, আকন্দ ছিলেন আওয়ামী লীগ এবং ভারতের স্বার্থরক্ষায় নিবেদিত। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর, শেখ মুজিব হত্যার বিচার শুরু হলে, সেই তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে। আকন্দের নেতৃত্বে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আসামি গ্রেফতার হয়, তবে তদন্তে তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য স্পষ্ট ছিল।
২০০১ সালে চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এলে আকন্দকে বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু হাসিনার প্রতি তার আনুগত্যের কারণে ২০০৮ সালে তিনি আবার ক্ষমতায় আসার পর, ডিসেম্বরে তাকে সিআইডিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০০৯ সালে মাত্র এক দিন কাজ করে তিনি অবসরে চলে যান, তবে পরে ওই বছরই তিনি পুনরায় সিআইডিতে যোগ দেন।
২০১১ সালে তিনি শেখ মুজিব হত্যার মামলায় নতুন অভিযোগপত্র দাখিল করেন, যেখানে চারদলীয় জোট সরকারের কিছু মন্ত্রী ও বিএনপি-জামায়াত নেতাদের নামও যুক্ত করা হয়। তার এই তদন্তে শেখ হাসিনার স্বার্থ বাস্তবায়নের চেষ্টা ছিল, যার মাধ্যমে তিনি বড় ধরনের ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জন করেন। দেশের বিভিন্ন জায়গায় একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট এবং বাড়ি গড়েছেন, কানাডাতেও একাধিক বাড়ি করেছেন।
আব্দুল কাহার আকন্দের কর্মকাণ্ড শুধুমাত্র দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, তিনি আন্তর্জাতিকভাবে বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকও হয়েছেন। তার ভাই, আবুল কাশেম আকন্দ, স্থানীয় এক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এবং তার নামেও বিপুল সম্পদ রয়েছে।
এছাড়া, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা এবং বিডিআর বিদ্রোহের তদন্তেও তার ভূমিকা ছিল। এইসব তদন্তের মাধ্যমে তিনি বিরোধী দল ও বিরোধী পক্ষের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অনেক নির্দোষ মানুষকে ফাঁসিয়ে দিয়েছেন। তার তদন্তের ফলস্বরূপ বহু নিরীহ মানুষকে হয়রানি করা হয়। ২০১৪ সালে, একটি আদালত তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়, কিন্তু তারপরও তাকে কোনো শাস্তি দেওয়া হয়নি।
আব্দুল কাহার আকন্দের শেষ চাকরি ছিল ২০১৯ সালে চুক্তিভিত্তিক, যখন তিনি অবশেষে চূড়ান্তভাবে অবসর গ্রহণ করেন। এরপর, ২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে আওয়ামী লীগ তাকে মনোনীত করেছিল। তবে নির্বাচনে তিনি জয়ী হতে পারেননি।
আব্দুল কাহার আকন্দের কীর্তি এখনও একটি বিতর্কিত বিষয়, এবং তার বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ ও ক্ষত এখনও ফুরায়নি। তার বিরুদ্ধে বিচার হওয়া উচিত বলে অনেকেই দাবি করে আসছেন।

Comments
Post a Comment